যে কারনে স্নান উৎসব ও লাঙ্গলবন্দ 

2

সোনারগাঁ বার্তা ২৪ ডটকম: নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলা ও বন্দর উপজেলার মাঝ দিয়ে বয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে প্রতি বছর পাপ মোচনের আশায়  চৈত্রের মাসের শুক্লাষ্টমী তিথিতে স্নান করতে আসেন দেশ বিদেশের সনাতন ধর্মালম্বীদের লাখ লাখ পুন্যার্থী।

শুক্রবার ১২ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া স্নানকে ঘিরে প্রস্তুত ব্রহ্মপুত্রের তীর লাঙ্গলবন্দ। পুণ্যার্থীদের বিশ্বাস তিথির নির্দিষ্ট সময়ে ব্রহ্মপুত্র নদে পুণ্যস্নান করলে সব পাপ মোচন হয়ে যায়। ১২ এপ্রিল শুক্রবার সকাল ১১টা ৫মিনিট থেকে পরদিন শনিবার সকাল ৮টা ৫৫মিনিট ২২ সেকেন্ড তিথি।

বাংলাদেশ হিন্দু কল্যাণ সংস্থার কেন্দ্রীয় সদস্য রনজিৎ মোদক জানান, এবার ললিত সাধুর ঘাট, অন্যপূর্ণ ঘাট, রাজ ঘাট, কালীগঞ্জ ঘাট, মা কুঁড়ি সাধুর ঘাট, মহাত্মা গান্ধী ঘাট, বড় দেশ্বরী ঘাট, জয়কালি ঘাট, রক্ষাকালী ঘাট, প্রেম তলা ঘাট, চর শ্রীরাম ঘাট, সাবদি ঘাট, বাসনকালী ও জগৎবন্ধু ঘাটে স্নান করা হবে।

লাঙ্গলবন্দ স্নান ও নামকরন নিয়ে কিছু কাহিনী রয়েছে। হিন্দু পুরান মতে, ত্রেতাযুগের সূচনাকালে মগধ রাজ্যে ভাগীরথীর উপনদী কৌশিকীর তীর ঘেঁষে এক সমৃদ্ধ নগরী ছিল, যার নাম ভোজকোট। এ নগরীতে ঋষি জমদগ্নির পাঁচ পুত্র সন্তানের মধ্যে প্রথম সন্তানের নাম রুষন্নন্ত, দ্বিতীয় পুত্রের নাম সুষেণ, তৃতীয় পুত্রের নাম বসু, চতুর্থ পুত্রের নাম বিশ্বাসুর, পরশুরাম ছিলেন সবার ছোট। পরশুরামের জন্মকালে বিশ্বজুড়ে চলছিল মহাসঙ্কট। একদিন পরশুরামের মা রেণুকা দেবী জল আনতে গঙ্গার তীরে যান।  সেখানে পদ্মমালী (মতান্তরে চিত্ররথ) নামক গন্ধবরাজ স্ত্রীসহ জলবিহার করছিলেন (মতান্তরে অপ্সরী গণসহ)। পদ্মমালীর রূপ এবং তাদের সমবেত জলবিহারের দৃশ্য রেণুকা দেবীকে এমনভাবে মোহিত করে  যে, তিনি তন্ময় হয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকেন।

অন্যদিকে ঋষি জমদগ্নির হোমবেলা পেরিয়ে যাচ্ছে, সেদিকে তার মোটেও খেয়াল নেই। সম্বিত ফিরে  পেয়ে রেণুকা দেবী কলস ভরে ঋষি জমদগ্নির সামনে হাত জোড় করে দাঁড়ান। তপোবলে ঋষি জমদগ্নি সবকিছু জানতে পেরে রেগে গিয়ে ছেলেদের মাকে হত্যার আদেশ দেন। প্রথম চার ছেলে মাকে হত্যা করতে অস্বীকৃতি জানান। কিন্তু পরশুরাম পিতার আদেশে মা এবং আদেশ পালন না করা ভাইদের কুঠার দিয়ে হত্যা করেন। পরবর্তীকালে পিতা খুশি হয়ে বর দিতে চাইলে তিনি মা এবং ভাইদের প্রাণ ফিরে চান। তাতেই রাজি হন ঋষি জমদগ্নি। কিন্তু মাতৃহত্যার পাপে পরশুরামের হাতে কুঠার লেগেই থাকে। অনেক চেষ্টা করেও সে কুঠার খসাতে পারেন না তিনি। এক পর্যায়ে পিতার কথামত পরশুরাম তীর্থে তীর্থে ঘুরতে লাগলেন। শেষে ভারতবর্ষের সব তীর্থ ঘুরে ব্রহ্মপুত্র পুণ্যজলে স্নান করে তার হাতের কুঠার খসে যায়। পরশুরাম মনে মনে ভাবেন, এই পুণ্য বারিধারা সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দিলে মানুষ খুব উপকৃত হবে। তাই তিনি হাতের খসে যাওয়া কুঠারকে লাঙ্গলে রূপান্তর করে পাথর কেটে হিমালয়ের পাদদেশ থেকে মর্ত্যলোকের সমভূমিতে সেই জলধারা নিয়ে আসেন। লাঙ্গল দিয়ে সমভূমির বুক চিরে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হন তিনি। ক্রমাগত ভূমি কর্ষণজনিত শ্রমে পরশুরাম ক্লান্ত হয়ে পড়েন এবং বর্তমান নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর থানায় এসে তিনি লাঙ্গল চালানো বন্ধ করেন। এই জন্য এই স্থানের নাম হয় লাঙ্গলবন্দ। এরপর এই জলধারা কোমল মাটির বুক চিরে ধলেশ্বরী নদীর সঙ্গে মিশেছে। পরবর্তীকালে এই মিলিত ধারা বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়েছে।

আরেকটা কথা জানিয়ে রাখি ব্রহ্মপুত্র নদের নামকরণ হওয়ার পেছনে মূল কারণ হল ব্রহ্মার এক ছেলে অভিসপ্ত হয়ে নদ রুপ ধারণ করে ও তার নদী জীবন সার্থক এবং মানব কল্যাণে লাগানোর জন্য ভগবান শিব তাকেই বেছে নেয়। যেই নদীতে স্নান করে দশাবতারের একজন পরশুরাম পাপমুক্ত হতে পারে সেই নদীতে যদি আমরা স্নান করতে পারি তাহলে অবশ্যই পাপের বোঝা কমাতে পারব। কিন্তু মনে থাকতে হবে অনুতপ্ততা অর্থাত্‍ পাপের অনুশোচনা। এই অনুশোচনা না থাকলে হাজার বছর গঙ্গায় ডুব দিলেও কোন লাভ হবে না। আমাদের উচিত মনের ময়লা দূর করে ভক্তি শ্রদ্ধা সহকারে ক্ষমা চাওয়া এবং এই নদীতে স্নান করা।

এই নিয়ে একটি কাহিণী আছে

একদিন মহাদের মা পাবর্তীকে নিয়ে ভ্রমনে করতে বের হয়েছে। মা পাবর্তী দেখলেন অনেক মানুষের সমাগম । তখন মা পাবর্তী শিবকে প্রশ্ন করলেন কি হচ্ছে এখানে?

শিব ঠাকুর বললেন, পাপ মুক্তির জন্য স্নান করছে । মা পাবর্তী বললেন সবাই কি পাপ মুক্ত হচ্ছে, শিব ঠাকুর বললেন চল একটি নাটকের মাধ্যমে তোমার উত্তর প্রদান করি । শিব ঠাকুরকে নিয়ে মা পাবর্তী ঘাটে বসে কান্নাকাটি করছে । আর বলছে আমার স্বামী মারা গেছে আমার স্বামীর শেষ কাজের জন্য কেউ সাহায্য করেন। তবে কোন পাপী ব্যক্তি আমার স্বামীকে স্পর্শ করতে পারবে না ।

সবাই চিন্তায় পড়ে গেল আমরা সবাই তো স্নান করেছি, তবে মহিলা এই কথা বলছে কেন ? আমরা কি পাপ মুক্ত হয় নাই । তথন একজন পাপী ব্যক্তি তাদের দেখে দয়া হল এবং বলল মা আমি জীবনে অনেক পাপ করেছি, আমি স্নান করে পাপ মুক্ত হয়ে তোমার স্বামীর শেষ কাজ করতে সাহায্য করব । এই কথা বলে লোকটি স্নান করে তাদের কাছে আসলে মা পাবর্তী ও মহাদেব তাকে নিজ রুপে দেখা দিয়ে চলে গেলেন । অর্থাৎ যা করতে হয় বিশ্বাসের সাথে করতে হয় ।

2